গ্লোবাল ট্যুর: চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং বানিজ্যিক রাজধানী ও প্রধানতম আন্তর্জাতিক নৌবন্দর চট্টগ্রাম। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেষে এর সোনালী সৈকত আর সারা বছর নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া বাংলাদেশকে অণ্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রের মর্যাদা দিয়েছে। খ্রিষ্টীয় ৭ম শতকে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং চট্টগ্রামকে কুয়াসা আর পানিতে ঘেরা ঘুমন্ত সুন্দরী আখ্যা দিয়ে ছিলেন। প্রাচীন যুগের এ বিশেষনই হওয়ার ফলে চট্টগ্রামকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের মূল শিল্পাঞ্চল। চট্রগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অরন্য বেষ্টিত পাহাড়, সমুদ্রের ঢেউ, উচু নিচু পাহাড়ি পথ, জলপ্রপাত সব সময় দেশী বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট করে আসছে।
চট্রগ্রামে যা যা দেখবেন :
১। পতেঙ্গার সাগর পাড় : কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে না যেয়েও আপনি পতেঙ্গার সমুদ্র সৈকতে যেয়ে সাগরে বেড়ানোর আনন্দ উপভোগ করতে পারবেন। চট্টগ্রাম রেল ষ্টেশন থেকে মাত্র ২২ কিলোমিটার দক্ষিণে এই সমুদ্র সৈকত অবস্থিত।
২। ফয়েজ লেক : চট্টগ্রামের অন্যতম আকর্ষণ ফয়েজ লেক। বৃটিশ শাসনামলের সময়ে রেল কোম্পানীর পানির চাহিদা মেটানোর জন্য রেল কোম্পানী চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ফয়েজ লেকটি খনন করে। লেকটি সব দিক ঘিরে রয়েছে পাহাড়, তাই লেকটি দেখতে হলে পাহাড় বেয়ে অনেকটা উপড়ে উঠতে হয়। অপূর্ব সুন্দর এই লেকের পাশেই রয়েছে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা। লেকে বেড়ানোর সাথে সাথে চিড়িয়াখানাও ঘুরে আসতে পারেন।
৩। ডিসি হিল, পরীর পাহাড, বাটালি পাহাড : পুরো চট্টগ্রাম জুড়ে রয়েছে অসংখ্য ভবন অনেক কাল ধরে অনেক পাহাড়, টিলা কেটে অসংখ্য ভবন রাস্তা ঘাট তৈরী করা হয়েছে। তবু এখনও অনেক পাহাড় টিলা চট্টগ্রামের রাস্তা ঘাটে ঘুরতে ঘুরতে আপনার চোখে পড়বে। টাইগার পাস গেলে দেখতে পাবেন, পাহাড় কেটে তৈরী করা হয়েছে রাস্তা, পাহাড়ের মাঝ দিয়ে চলে গেছে একটি রাস্তা, আবার পাহাড়ের নিচে দিয়ে চলে গেছে আরেকটি রাস্তা। তাছাড়া চট্টগ্রাম শহরের প্রান কেন্দ্রে রয়েছে বাটালী পাহাড়, ডিসি হিল, পরীর পাহাড়।
৪। ওয়ার সিমেট্রি : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ গ্রহনকারী নিহত সাতশ এর অধিক মিত্র বাহিনী এবং জাপানী সৈন্যের সমাধিস্থল হচ্ছে এই ওয়ার সিমেট্রি। ওয়ার সিমেট্রির চারদিকে রয়েছে। সুন্দর ফুলের বাগান যা আপনাকে মুগ্ধ করবে। চট্টগ্রাম নগরীর প্রবর্তক মোড়ের পাশেই ওয়ার সিমেট্রির অবস্থান।
৫। চট্টগ্রাম বন্দও : দেশের সর্ববৃহৎ নৌ বন্দর এই চট্টগ্রাম নৌ বন্দর। কর্ণফুলি নদীর মোহনায় এই বন্দরের অবস্থান। এখানে ইচ্ছা হলে জাহাজের ভিতরে প্রবেশ করে ঘুরে ঘুওে পথবেক্ষণ করতে পারেন। পর্যবেক্ষণের জন্য আপনাকে অবশ্যই কতৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।
৬। সুলতান বায়েজিদ বোস্তামী ও হযরত শাহ আমানত এর মাজার : চট্টগ্রামকে বার আউলিয়ার দেশ বলা হয়। চট্টগ্রামের ৫ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে রয়েছে সুলতান বায়েজিদ বোস্তামির মাজার। সুলতান বায়েজিদ বোস্তামীর মাজারের ১টি বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে শত শত কচ্ছপ
এই কচ্ছপগুলো মাজারের সাথে ১টি পুকুরে বাস করে। এখানে তিন/চার শত বছরের পুরাতন কচ্ছপও রয়েছে।
৭। সিতাকুন্ড : চট্টগ্রাম থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সিতাকুন্ড বিখ্যাত
চন্দ্রনাথ মন্দির এবং বৌদ্ধ মন্দিরের জন্য। এখানে গৌতম বুদ্ধের পায়ের চাপ রয়েছে। এ মন্দির গুলো হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের নিকট অত্যন্ত পবিত্র স্থান।
কক্সবাজার : ঢাকা থেকে ৩১৬ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম থেকে ১০০ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত কক্সবাজার। কক্সবাজারকে বাংলাদেশের পর্যটন রাজধানী বলা হয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে দর্শনীয় এবং স্বাস্থ্যকর স্থান এই কক্সবাজার। কক্সবাজারে রয়েছে ১২০ কিলোমিটার বিশিষ্ট পথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত। শুধু বাংলাদেশ নয় সারা বিশ্বে কক্সবাজার সমদ্র সৈকতের খ্যাতি রয়েছে। তাই বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণ প্রিয়াসীরা কক্সবাজারে ছুটে আসেন এর সৌন্দর্য অবলোকন করতে। সূর্য ডোবার সময় সৈকতে এক অদ্ভুত সৌন্দর্যের অবতারনা হয়। এ সময় ছবি তুলতে ভুলবেন না। সাগরের নীল পানিতে গোসল এবং সাতার কাটা ভীষণ রোমাঞ্চকর। গোসলের সময় পানির নীচে একটু হাতা হাতি করলেই শিকার করতে পারবেন তারা মাছ। পর্যটন কর্পোরেশনের রঙিন ছাতা, চেয়ার ও ঘোড়াতে চড়ে সৈকত বেড়ানোর ব্যবস্থা করে সৈকতকে পর্যটকদের নিকট আরো আকর্ষনীয় করে তুলেছে। নির্দিষ্ট পরিমান চার্জ দিয়ে আপনিও পর্যটনের এই জিনিষগুলো উপভোগ করতে পারেন। তাছাড়াও সৈকতের নিকট মোটেল শৈবালে আছে। সুইমিংপুল, গলফ, টেনিস ও স্কোয়াশ কোর্ট, হেলথ ক্লাব ও কনফারেন্স হল।
সতর্কতা: সৈকতে গোসলের সময় অবশ্যই বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করবেন, না হলে মারাতœক দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। গোসলের সময় লক্ষ্য রাখবেন আপনি বা আপনার সঙ্গীরা সাহস দেখাতে যেন সাগরের দিকে খুব দূরে চলে না যায়। যখন সাগর পাড়ে লাল পতাকা দেখবেন তখন সাগরে গোসল করা নিরাপদ নয়। গোসলের সময় লক্ষ্য করুন সবুজ পতাকা ওড়ানো হয়েছে কি না। সবুজ পতাকা নিরাপদ সংকেত বহন করে।
বার্মিজ মার্কেটে কেনাকাটা: কক্সবাজারের বার্মিজ মার্কেটের আর্কষণও কম নয়। শহরের প্রধান সড়কের পশ্চিম টেকপাড়া এলাকায় অবস্থিত এই মার্কেট। বার্মা থেকে বহুকাল পূর্বে আগত রাখাইন সম্প্রদায়ের মেয়েদের দ্বারা পরিচালিত হয়। এই মার্কেটে দোকানের সংখ্যা কয়েকশ। ভ্রমণকারীদের নিকট অত্যন্ত জনপ্রিয় এই মার্কেটে বার্মা, চীন এবং ইল্যান্ডের অত্যন্ত আকর্ষণীয় পণ্য পাওয়া যায়, যা দেশের অন্য কোথাও চোখে পড়েনা। মার্কেটে প্রবেশ করলে একটা নতুনত্বের ছোঁয়া পাওয়া যায়। কারন এখানে দোকান পরিচালনা করেন রাখাই সম্প্রদায়ের সুন্দরী, স্মার্ট মেয়েরা। এরা নিজেদেও সাথে কথা বলে রাখাইন ভাষায়। কিন্তু ক্রেতাদের সঙ্গে সুন্দর বাংলা ভাষায়কথা বলে। কক্সবাজারের আশে পাশে রয়েছে কিছু দর্শনীয় স্থান যেখানে দিনে যেয়ে দিনেই আসতে পারেন। স্থান গুলো হচ্ছে হিমছড়ি ও মহেশখালী।
টেকনাফ: কক্সবাজার থেকে ৮৫ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের বাংলাদেশের দক্ষিণ সীমান্তে প্রাকৃতিক অপরুপ শোভায় সজ্জিত টেকনাফ অবস্থিত। টেকনাফের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে নাফ নদী। এই নাফ নদী টেকনাফকে মায়ানমার থেকে আলাদা করেছে। নাফ নদীর ওপাড়ে রয়েছে মায়ানমারের মন্ডু শহর। এছাড়া টেকনাফের দর্শনীয় স্থান হচ্ছে থানার পাশের মানির ক’প, হাতি সংরক্ষন এলাকা। এখানের পাহাড়ের চূড়ায় উঠলে দেখতে পাবেন অপর্ব সুন্দর শাহপরী ও সেন্টমার্টিন দ্বীপ।
পাবত্য চট্টগ্রাম: পাহাড়, লেক, বন-জঙ্গল ভরা পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। এখানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উজার করে, মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও এখানে বসবাসরত উপজাতীয়দের জীবন যাত্রাও পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম আকর্ষণ। উপজাতীয় পরিবার গুলো মাতৃপ্রধান। এখানে মহিলারা পরুষদের থেকে বেশি শ্রম দেয় এবং পরিবারের উপার্জনের প্রধান উৎস। সততা এবং আতিথিয়তা করা এদের বিশেষ গুন। এরা ভ্রমণার্থীদের দেখলে খুশি হয়। ইচ্ছে করলে আপনি এদের সাথে আলাপ আলোচনা করতে পারেন। পার্বত্য চট্টগ্রামকে ৩টি জেলায় বিভক্ত করা হয়েছে। জেলাগুলো হচ্ছে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবন।
রাঙ্গামাটি: চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ৭৭ কিলোমিটার দূরে রাঙ্গামাটি অবস্থিত। পার্বত্য অঞ্চল বাংলাদেশের উপজাতিদের প্রধান বাসস্থান। কাপ্তাই লেকের দিকে অবস্থিত রাঙ্গামাটি একসময় পুরোটাই ছিল গভীর অরণ্য ঘেরা। মাত্র চল্লিশ বছর আগে বনাঞ্চল কেটে রাঙ্গামাটি শহর তৈরী করা হয়। সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে রাঙ্গামাটি শহরের বয়স বেশি নয়। কিন্তু রাঙ্গামাটির সৌন্দর্য বাংলাদেশের যে কোন এলাকাকে হার মানায়। রাঙ্গামাটির কাছেই ৬৮০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের বিশাল কাপ্তাই হ্রদ আপনাকে মুগ্ধ করবে। রাঙ্গামাটির পর্যটন এলাকায় দেখতে পাবেন ঝুলন্ত ব্রীজ, যা অনেক ক্যলেন্ডার, পোষ্টার, ভিউকার্ড ইত্যাদির ছবিতে প্রচুর দেখেছেন। প্রচুর দেশি বিদেশি পর্যটক এই রাঙ্গামাটি সফর করে।
কাপ্তাই: কাপ্তাই লেকের জন্য বিখ্যাত। চট্টগ্রাম থেকে ৬৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কাপ্তাই লেক। চট্টগ্রাম থেকে কাপ্তাই সড়ক পথে যেতে খুব মনোরম দৃশ্য আপনার চোখে পড়বে। কাপ্তাই লেকের নয়ন জুড়ানো দৃশ্য দেখার জন্য অনেক পর্যটকের সমাগম হয় এখানে।
চন্দ্রঘোনা: চট্টগ্রাম থেকে ৪৮ কিলোমিটার দূরে কাপ্তাই সড়কে পড়বে চন্দ্রঘোনা। চন্দ্ররাজার নামে চন্দ্রঘোনায় রয়েছে এশিয়ার বৃহৎ পেপার মিল। পেপার মিলের কাছেই রয়েছে একটি রেয়ন মিল। যেখানে বাস থেকে সিথেটিকের ফাইবার তৈরি করা হয়। কাপ্তাই যাওয়ার পথে চন্দ্রঘোনা বেড়িয়ে তারপর কাপ্তাই যেতে পারেন।
বান্দরবন: চট্টগ্রাম থেকে ৯২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থান বান্দরবন। বান্দরবন শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র সেখলা। পাহাড় বেষ্টিত করে রেখেছে সেখলা পর্যটনকেন্দ্রকে। সেখলায় রয়েছে ৩০ একর জায়গা জুড়ে কৃত্রিম লেক। লেকের পানিতে নৌকা বা স্পিড বোটে চড়ে নৌবিহার করতে পারেন। এছাড়াও চিত্তবিনোদনের জন্য এখানে রয়েছে মাছ ধরার ব্যবস্থা। লেকের অপরপাড়ে রয়েছে আকর্ষণীয় পিকনিক স্পট গোলকুপা। বান্দরবনের আরেক আকর্ষণ হচ্ছে এখানের জলপ্রপাত। বিশাল সুন্দর সিড়ি বেয়ে নামা যায় এখানের জলপ্রপাতে। জলপ্রপাত ছাড়াও জলপ্রপাত ছাড়াও এখানে রয়েছে ঝর্ণা। বান্দরবনের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে শংখ নদী। শংখ নদীর পাড়ে রয়েছে শাপলা চত্বর। রয়েছে রঙ্গিন আলোর মধ্যে পানির ফোয়ারা। এছাড়াও ভ্রমণ করতে পারেন বান্দরবন থেকে ৬৪ কিলোমিটার দূওে কেউকাড়াডাং পর্বত।
Visit Our Social Site: Group: https://www.facebook.com/groups/globaltourb Page: https://www.facebook.com/globaltourb
Recent Comments